সংগীতে আমাদের সম্পর্ক ৪৫ বছরের। ‘রিদম ৭৭’ নামে একটা গানের দল করেছিলাম। সেই সময় থেকে হিসাব করলেও ৪১ বছর। অনেক ছোট ছোট স্মৃতি আছে আমাদের। একে অন্যের অনেক ক্রিয়েশনের সাক্ষী আমরা। অনেক আবেগ–অনুভূতির ও দুঃখ–বেদনার সাক্ষী।

আইয়ুব বাচ্চু যখন প্রথম ঢাকায় আসে, আমার বাসায় ছিল। অনেক দিন আমরা এক বিছানায় ঘুমিয়েছি। দুই রুমের সেই বাসাটার এক রুমে সে প্র্যাকটিস করত, আরেক রুমে আমি করতাম। খাওয়াদাওয়া করতাম একসঙ্গে। পরে আমার বাসার পাশেই বাসা ভাড়া নেয়। জানালা দিয়ে কথা হতো। আমার বাসায় থেকে তাঁর প্রেম হয়, এরপর পরিণয়। সেই বিয়ের বাজার পর্যন্ত করেছিলাম। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত একসঙ্গে ছিলাম। পরশু দিনও আমার সঙ্গে কথা হয়েছে। কথা শেষ করার আগে শুধু বলল, ‘দোস্ত, মাসিমাকে দেখতে আসব।’ সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার হচ্ছে, মাকে বলতে পারিনি। মা বাচ্চুকে আরেকটা সন্তান বানিয়েছেন। সে আমার শুধু বন্ধু না, ভাইও।

অসময়ে ভাইয়ের চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছি না। বললে কেমন শোনাবে জানি না, এটা আমার সঙ্গে প্রতারণার মতো। তুই আমারে ফেলে কেন চলে গেলি। আমরা যখন স্ট্রাগল করছিলাম, তখনো গানকে পেশা হিসেবে নেওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়নি। আজ গানকে পেশা হিসেবে নেওয়ার মতো একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে। সেটা তৈরির পেছনে যারা কাজ করেছে, সে রকম ১০ জনের সে–ও একজন। স্টেজে গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহের যুদ্ধটা বাংলাদেশে যারা শুরু করেছিল, সে তাদের একজন।

আমরা ফিলিংস ব্যান্ডটা করেছিলাম ১৯৭৯-৮০ সালের দিকে। তখন আমরা হোটেল আগ্রাবাদে বাজাতাম। হোটেলটার নাইট ক্লাবে বাজাত সোলস্‌, আমরা বাজাতাম সুইমিংপুলের কাছে। সেটা ছিল ইনট্রুমেন্টাল। ওখানে বাজিয়েই বাচ্চুর হাত পাকে। পৃথিবীর নামকরা সব গিটারিস্টের বাদন তুলে নিয়ে বাজাতে পারত সে। এই কাজে একপর্যায়ে সে দারুণ পারদর্শী হয়ে ওঠে। তাঁর ক্রিয়েশনের মধ্যে ছিল আধুনিকতা, উপস্থাপনে ছিল স্মার্টনেস। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বৈশ্বিক, পরিবেশনা ছিল বিশ্বমানের। অনেকে আছে খুব ভালো গিটার বাজায়, কিন্তু বাচ্চু দর্শক-শ্রোতার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতে পারত। এমনও হয়েছে যে একটা গান তিনবারও শুনতে চাইত লোকে। আমার অনেক গান সে সুর করেছে, অনেক গানে সে গিটার বাজিয়েছে। ‘চন্দনা গো’ গানে বাজিয়েছিল, ‘পুতুলের মতো করে সাজিয়ে’ গানের নতুন সংস্করণে সে বাজিয়েছে।

একটা সময় আমরা বিয়ের অনুষ্ঠানে গান করতাম। সেটা ছিল নিজেদের যাচাই করার একটা ভালো জায়গা। তো, সে রকম অনুষ্ঠানে শো করতে গেলে নানা রকম প্রস্তাব আর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হতো। বলা হতো, বরের হবু শালিকে খুশি করতে না পারলে তাহলে সম্মানী দেওয়া হবে না। এমনও হয়েছে, বাবা বলছে মোহাম্মাদ রফির গান গাইতে। গাইতে না পারলে সম্মানী দিত না। ইনট্রুমেন্ট আটকে রাখত। এ রকম নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে আমি আর বাচ্চু গিয়েছি। চট্টগ্রামের অলিগলি, পাড়া-মহল্লা, বিয়ে-জন্মদিনসহ এমন কোনো অনুষ্ঠান ছিল না, যেখানে সে বাজায়নি।

একটা ঘটনার কথা আজ মনে পড়ছে। সংগীতজীবনের একেবারে শুরুর দিকের কথা। বাসাবোর একটা হোটেলে ছিলাম দুজন। দুজনের পেটেই ক্ষুধা, কিন্তু কারও পকেটেই টাকা নেই। দুজনে ভাগ করে কোনো রকম নাশতাটা খেতে পারব, সে কয় টাকা ছিল। হোটেলের বয়কে নাশতা আনতে বললাম। কাগজে মুড়ে পরোটা আর ডিম আনা হলো। কাগজ ভিজে ডিম–পরোটা গেল পড়ে। মেঝে থেকে সেই খাবার তুলে ময়লাটুকু ফেলে দিয়ে দুজনে খেয়েছিলাম।

সূত্র – প্রথম আলো