মেয়েদের আত্মবিশ্বাস নিয়ে লিখেছেন পুষ্পিতা মন্ডল :

একটা মেয়ে কয়েকমাস হলো বিয়ে হয়েছে। ভালবাসার বিয়ে। অন্তত মেয়েটা তাই মনে করেছিলো। মাসদুয়েকের মধ্যে বিয়ে। আমার পরিচিত ছোটবোন। ওরা যে বিয়ে করেছে এইটা অবশ্য জানতাম না। গাদাগাদা মেসেজ দিচ্ছে। নতুন সংসার নিয়ে। কষ্টের মেসেজ। ও খুব ভালো একটা জব করে। বেশ ভালো বেতন। হাজবেন্ড মেবি বিয়েটা এইজন্য করেছে। কিন্তু এখন তো বিয়ে শেষ। সারাদিন সে মেন্টাল ফিজিক্যাল টর্চার করছে মেয়েটার উপর। অপমানজনক কথাবার্তা। যার মধ্যে একটা হলো ওর চেহারা নিয়ে খোঁচা দেওয়া। পতিদেবের ভাষায় তার বউ খুব বিশ্রী দেখতে, কালো ইত্যাদি ইত্যাদি।এই মেয়ে বোরখা পরে না, তারমানে সে বিয়ের আগে না দেখে তো বিয়ে করে নাই। যদি তাই হয়ে থাকে তবে এইগুলা নিয়ে কথা আসে কেন?

দুনিয়ায় যতো ধরনের নোংরা ট্রল আছে তার মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য হচ্ছে কারো চেহারা নিয় কথা বলা বা তুলনা করা। কে ফর্সা, কালো, লম্বা, খাটো এইসব বলার চেয়ে বাজে কিছু মনে হয় নাই। অমুকতো তোমার চেয়ে সুন্দর, তমুক এমন এইসব বলার আসলে কতোটা দরকার আছে? তবু অবলীলায় সবাই তাই করে যায়। হয়তো খুব কাছের কাউকেই বলে ফেলে। আর এইছেলে তো আমার ওই ছোটবোনটাকে আঘাত দেওয়ার একটা অস্ত্র করে নিয়েছে।

কিন্তু এইসব কথায় মেয়েরা কেন মন খারাপ করে? এতো চেহারা বা এইসব নিয় ভাবনা মেয়েদের এতো কেন? ছোটবেলা থেকে সুন্দর হওয়ার এইযে একটা চিন্তা ঢুকে যায় মাথায় এইটা থেকে বেরই হতে পারে না। আমি মেয়ে তারমানে আমাকে সেই সুন্দরী হতে হবে। গল্প, উপন্যাস, সিনেমায় যতো প্রেমিকার বর্ননা সবাই সেই রূপসী। সেই সুন্দর শরীর তাদের। বেশ সুন্দর হওয়া খারাপ কিছু না। কিন্তু মেয়েদের ভালোবাসার একমাত্র মাপকাঠি তাদের সৌন্দর্য? আজকে একজনকে বলছিলাম যে একআপুকে তার হাজবেন্ড অনেক ভালোবাসে। অমনি সে জিজ্ঞেস করলে কেন আপু কি অনেক সুন্দর?? আচ্ছা ছেলেদের তাহলে কি দেখে ভালোবাসবে মেয়েরা? মাপকাঠিটা ঠিক কি?

একটা মেয়ের মাথায় এই জিনিস এমন করে ঢোকে যে একটু বাইরে যেতে গেলেও হাজারবার আয়না দেখবে। ভালো দেখায় কিনা, মোটা লাগে নাতো, কালো হয়ে যাচ্ছি নাতো, কি মাখলে ফর্সা হবো এইসব। এই ট্রিটমেন্ট ওই ট্রিটমেন্ট কতোকিছু। শ্রীদেব বেচারা মরেই গেলো এই করতে গিয়ে। বিদেশে এসে দেখেছি গাদা গাদা মেয়ে ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট করায়। অনেকের বয়স ১৮ ও হয় নাই। বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েরা। সিরিয়াসলি অবাক হই! এতো পারফেক্ট হতে হবে কেন? কার জন্য কিসের জন্য?

প্রচুর মেকআপ করা এক বান্ধবী একদিন বলেছিলো মেকআপ করলে নাকি তার কনফিডেন্স বাড়ে। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। মেকআপে সুন্দর লাগে হয়তো, অনেকে ভালোও বাসে সাজতে কিন্তু তারসাথে কনফিডেন্স আসার সম্পর্ক কি? আমি যখন খুব খুব বাজে সময় পার করেছি, নতুন একটা দেশে হঠাৎ টালমাটাল অবস্থা তখন তো মেকআপ করে ঘুরে বেড়াই নি। তখন যেটা সাথে ছিলো সেইটা আমার সাহস আর আত্মবিশ্বাস। অন্যকোনকিছু কি দরকার আছে?

মেয়েদের আত্মবিশ্বাস এই চেহারায় এসে আটকে যায় কেন? ছেলেদেরতো যায় না। উনারা কি সব টম ক্রুজের বাঙালি সংস্করন? প্রেমিক মহাশয় দুপুরে ছবি পাঠিয়ে বলেছেন উনাকে নাকি বাজে দেখতে লাগছে ওইসময়। উনারে বাজে না কি দেখায় এইটাই আমার কোনদিন দেখা হয় নাই। সে ঘুম ঘুম চোখে ছবি দিলেও যা লাগে, মাঞ্জা মাইরা দিলেও অনুভূতি একই রকম। যাকে ভালোবাসে মানুষ সে অন্য দশজন থেকে আলাদা হয়ে একেবারে একাদশতম হয়। আমার ছোট বুদ্ধি অনন্ত তাই বলে।

বহুদিন আগে একদিন দিদি নাম্বার ওয়ান দেখছিলাম। সব কাপলরা আসছে। বরেরা বসে আছে। আমাদের ভাষায় ঠিক সুন্দরী না তেমন মেয়েকে রচনা ব্যানার্জী জিজ্ঞেস করেছে” বরের সাথে যখন বের হও নিজেকে কেমন লাগে?” মেয়ের উত্তর ছিলো” ডানাকাটা পরী”! মানুষ আসলে প্রিয়জনের চোখেই হয়তো নিজেকে দেখে। তাই তাকে অপমান করার চেয়ে বাজে আরকিছু আছে কি? আর যদি কেউ করেই থাকে তাতেও মন খারাপ করার কিছু নাই। যে যার মতো, সবাই সবার মতো সুন্দর।

সো ডিয়ার গার্লস কে আপনার চেহারা নিয়ে কি বলল, আপনারে কেমন লাগছে ইত্যাদি নিয়ে এতো মন খারাপ করার আসলেই কিছু নাই। ছেলেরা কিন্তু করে না। আপনি কেন করেন?? আপনি আপনার মতো। নিজেরে ভালোবাসেন। যদি আপনার পার্টনারও এইগুলা বলে তারে বলবেন তুমি আগে ছয় ফিট হাইট আর এইট প্যাক অ্যাবস বানায়ে নিয়ে আসো। আমি আমার মতো। আমাকে অন্যদের সাথে তুলনা দেওয়া বন্ধ করো। ভালো লাগে তো আমার সাথে থাকো, নাহলে ভগার খালে গিয়ে ডুইবা মরো।