Bangla Music‘একটাই কথা আছে বাংলাতে/মুখ আর বুক বলে একসাথে/সে হল বন্ধু, বন্ধু আমার…’। বন্ধুত্বের জন্য বাংলাভাষীদের কাছে এর চেয়ে সহজ-সরল আর গ্রহণযোগ্য কথা বাংলা গানের ইতিহাসে সম্ভবত আর নেই। এটি ছিল বন্ধু আমার চলচ্চিত্রের গান। গানটি দ্বৈতভাবে গেয়েছিলেন বাপ্পি লাহিড়ী ও আবদুল আজিজ। দুজনই এপার-ওপার দুই বাংলার জনপ্রিয় শিল্পী। দুই বাংলার আরেক জনপ্রিয় শিল্পী সুমন চট্টোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘সহজ কথা সহজ করে বলতে গেলে দুটি মানুষের মধ্যে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা ভাগাভাগি করার অকৃত্রিম সম্পর্কের নাম বন্ধুত্ব। নিজের গাওয়া একটি গানে তিনি বন্ধুত্বের আহ্বান জানিয়েছেন এভাবে- ‘তোমায় আমি গড়তে চাই না, পড়তে চাই না, কাড়তে চাই না, নাড়তে চাই না, ফুলের মত পাড়তে চাই না- চাইছি তোমার বন্ধুতা…।’ প্রকৃতিগতভাবেই মানুষ বন্ধুত্বের কাঙাল। প্রতিটি মানুষই বন্ধুত্ব চায়। জনপ্রিয় ব্যান্ড নগর বাউলের কর্ণধার জেমস তার সঙ্গীত জীবনের প্রথম দিকেই বন্ধুত্বের জন্য আকুল হয়ে গেয়েছিলেন, ‘তোমাদের মাঝে কেউ কি আছে বন্ধু আমার/তোমাদের মাঝে কেউ কি আছে পথহারা/তবে বন্ধু নৌকা ভেড়াও/মুছিয়ে দেবো দুঃখ সবার…’। সেই সময় জেমসের মন-নদীর তীরে এসে ঠিকই নৌকা ভিড়িয়েছে অসংখ্য বন্ধু। তাদের সবাই জেমসের গানের শ্রোতা। জেমস বলেন, যারা আমার গান শোনে, আমার গান যারা ভালোবাসে, তারাই আমার আসল বন্ধু। তাদের সঙ্গেই আমি গানে গানে শেয়ার করি আমার সুখ, আমার দুঃখ।

জেমসের মতো প্রতিটি বন্ধুই নিজের আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করতে চায় বন্ধুর সঙ্গে। বন্ধুর বুকভরা জ্বালা নিজের মধ্যে ধারণ করতে চায়। বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পী আবদুল জব্বার যখন গেয়ে ওঠেন- ‘এক বুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু তুমি/কেন একা বয়ে বেড়াও/আমায় যদি তুমি বন্ধু মানো/কিছু জ্বালা আমায় দাও…’ তখন সেটা হয়ে ওঠে বন্ধুপ্রিয় সব মানুষের মনের গান। আবদুল জব্বার বলেন, এটি মস্তান চলচ্চিত্রের গান। গানটিতে কণ্ঠ দিতে গিয়ে আমি খুব ইমোশনাল হয়ে পড়েছিলাম। আমার এক বন্ধুর কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। ওর নাম আবুল কাশেম। ও আমার বাল্যবন্ধু। পারিবারিক একটা ব্যাপার নিয়ে ও তখন খুব কষ্টে ছিল। শেষে আমি ওর কষ্টের কথা ভাবতে ভাবতেই গানটি গেয়েছিলাম এবং এ জন্যই গানটিতে যে আবেগ দরকার ছিল তা ফুটিয়ে তুলতে পেরেছিলাম। আমার বন্ধুদের মধ্যে ও-ই সেরা এবং কেবল ওর সঙ্গেই এখন পর্যন্ত যোগাযোগ রয়েছে। ও একজন ভালো গীতিকার। এ পর্যন্ত আমি ওর অনেক গান গেয়েছি।

বাংলা গানের বিশাল ভাণ্ডারে বন্ধুকে নিয়ে এমনিভাবে ছড়িয়ে আছে অনেক গান। বন্ধুর জন্য ভালোবাসা, বন্ধুর জন্য গান। কুমার বিশ্বজিৎ তার বন্ধুর জন্য গেয়েছেন- ‘বন্ধুরে তোর লাগি এই গান গাওয়া, বন্ধুরে তোর লাগি এই পথ চাওয়া’। গানটি লিখেছেন আসিফ ইকবাল, সুর করেছেন কুমার বিশ্বজিৎ নিজেই। কুমার বিশ্বজিতের বন্ধুর তালিকা বেশ লম্বা। ‘গানের জগৎ এবং গানের জগতের বাইরে আমার অসংখ্য বন্ধু-বান্ধব রয়েছে’, বললেন কুমার বিশ্বজিৎ। উল্লেখযোগ্য বন্ধুদের মধ্যে রয়েছে নকীব খান, জেমস্‌, আইয়ুব বাচ্চু, আসিফ ইকবাল, নজরুল ইসলাম বাবু। এর মধ্যে নজরুল ইসলাম বাবু এবং নকীব খান আমার সিনিয়র বন্ধু। জেমস এবং বাচ্চু প্রায় সমবয়সী। আর আসিফ ইকবাল আমার জুনিয়র বন্ধু। চট্টগ্রামে থাকা অবস্থায়ই আমাদের পরিচয় এবং বন্ধুত্ব। অবশ্য মিউজিক করতে গিয়েই আমাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। এখনো আমরা সবাই সবাইকে খুব ফিল করি।

বন্ধুদের কথা মনে করতে গিয়ে ফাহ্‌মিদা নবীর কেবলই মনে পড়ে ছেলেবেলার বন্ধুদের কথা। সর্বশেষ একক অ্যালবামের ক্লাস টু গানটি তারই বহির্প্রকাশ। ‘ছেলেবেলার বন্ধুদেরই আমি সবচেয়ে বেশি ফিল করি’- বললেন ফাহ্‌মিদা নবী। ‘ছেলেবেলায় আমার একটা বোবা বন্ধু ছিল। ওর নাম আঞ্জুম। কেমন করে যেন ওর সঙ্গে আমার খুবই ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। ও এখন সুইডেন থাকে। অনেক দিন যোগাযোগ নেই, কিন্তু ওর কথা আমার খুব মনে পড়ে। আরেক বন্ধুর নাম কবির। ওর প্রেমিকার নাম ছিল কবিতা। ও থাকে আমেরিকায়। ওর সঙ্গেও যোগাযোগ নেই। ও আমার অনেক কাছের বন্ধু ছিল। ওর সঙ্গে আমি সবকিছুই শেয়ার করতে পারতাম। নিজের কথা সবচেয়ে বেশি যে বন্ধুর সঙ্গে শেয়ার করতে পারি, তার নাম শিখা। ওর সঙ্গে কোনো কিছু শেয়ার করতে আমার লজ্জা নেই, দ্বিধা নেই, আড়ষ্টতা নেই। খুব সহজেই ওকে বকা দিতে পারি, গালি দিতে পারি। ও ধানমণ্ডিতে থাকে।

সাম্প্রতিক সময়ে বন্ধুকে নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত এবং আলোড়িত গানটি গেয়েছেন পার্থ বড়ুয়া। গানটি খুবই দুঃখের। ‘একলা ঘর/ধুলো জমা গিটার/পড়ে আছে লেনিন/পড়ে আছে শেক্সপিয়ার/টি-শার্ট জিন্সগুলো দেয়ালে আছে/শুধু মানুষটা তুই নেই তো/নেই তো কাছে/ও বন্ধু তোকে মিস করছি ভীষণ/তোকে ছাড়া কিছুই আর জমে না এখন…’। এ মানুষটা প্রয়াত সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ইমরান আহমেদ মবিন। চট্টগ্রামে শো করতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন তিনি। তার এই অকাল মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি পার্থ বড়ুয়া। মবিনের স্মৃতি ধরে রাখার জন্যই পার্থ বড়ুয়ার এই গান গাওয়া। এ প্রসঙ্গে পার্থ বড়ুয়া বলেন, মবিন যখন টুকটাক সাউন্ডের কাজ করছে তখন থেকেই ওর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। আমার গাওয়া জীবনের প্রথম গান এই তো সেদিন মবিনের সাউন্ড করা। আমার মিউজিক ডিরেকশনে পলাশের প্রথম অ্যালবাম মবিনের সাউন্ড করা। সোলসের অনেক অ্যালবামেরই সাউন্ড করেছে মবিন। মবিন সোলসের সঙ্গে প্রায় এক বছর বেইজ গিটার বাজিয়েছে। ওই এক বছর আমরা প্রায় প্রতিটি দিনই একসঙ্গে ছিলাম। আমাদের টু-লেট অ্যালবামটি আমরা মবিনকে উৎসর্গ করেছিলাম। এ অ্যালবামটির সঙ্গে ও ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। মবিনের মতো সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার বাংলাদেশে আর আসবে কি না সন্দেহ। মবিন ছাড়াও এ রকম আর কাকে কাকে মিস করেন? এমন প্রশ্নের জবাবে পার্থ বড়ুয়া বলেন, ‘দিপু নামে আমার খুব ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু ছিল। প্রায় বছর দশেক আগে কিডনি ফেইল করে মারা গিয়েছে। ওর সঙ্গে জীবনের একটা বিশাল সময় কাটিয়েছি আমি। ওর প্রিয় খাবার ছিল বিরিয়ানি। প্রায় দুপুরেই ও বলতো ‘চল বিরানী খাই’। এখন বিরিয়ানি খেতে গেলেই ওর কথা মনে পড়ে। ওকে খুব মিস করি। আরেক বন্ধু কল্লোল রায়কেও খুব মিস করি। তিনি ছিলেন আমার ইউনিভার্সিটির বড় ভাই। বড় হলেও আমাদের বন্ধুত্ব ছিল খুবই গাঢ়। তার কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। আমি যখন একটু একটু গান-বাজনা করি, তখন তিনি আমাকে খুব উৎসাহ দিতেন, গাইড করতেন। কি শুনবো, কি শুনবো না- এসব নিয়ে পরামর্শ দিতেন। তিনি খুব ভালো গান গাইতেন, চমৎকার ঢোল বাজাতেন, ভালো অভিনয়ও করতেন। বলা যায়, গান-বাজনায় আমাকে সবচেয়ে বেশি ইনফ্লুয়েন্স করেছেন তিনি। প্রায়ই তাকে মিস করি।

সূত্রঃ যায়যায়দিন।