‘আমার একটি নদী ছিল’ ও ‘পাখি উড়িয়া উড়িয়া যায়’-এর মতো জনপ্রিয় গানের সংগীতশিল্পী পথিক নবী এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কোনো অ্যালবামে নেই। ২০০৫ সালের পর নতুন কোনো গান রেকর্ডিংও করেননি এ শিল্পী।
ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে হঠাৎ তার ছন্দপতন কেন? এমন প্রশ্নই তার ভক্তদের মুখ থেকে মুখে ফিরছে। তেমনই কিছু প্রশ্নের উত্তর নিয়ে গ্লিটজের পাঠকদের সামনে হাজির হলেন তিনি।

গ্লিটজ: ২০০৫ সালের পর আপনাকে আর কোনো অ্যালবামে দেখা যায়নি; গত এক যুগে নতুন কোনো গান প্রকাশ করেননি কেন?

পথিক নবী: উৎপাদন খরচ বহন করতে পারব না। আমার উপার্জন তো অল্প; কোনো ভাবে টিকে আছি। কারো কাছে হাত পাততে হয় না। ভালো কিছু করতে গেলে পৃষ্ঠপোষকতা লাগবে। ভালো একটা গান রেকর্ডিং করা, একটা মিউজিক ভিডিও বানানোর টাকা আমার কাছে নাই। সত্যি বলতে, ভালো ভালো কিছু গান লেখা আছে আমার কিন্তু নগদ টাকা নেই। স্টেজ পারফরমেন্স করে কোনো ভাবে টিকে আছি।

গ্লিটজ: সহসাই তাহলে আপনাকে গানে পাচ্ছে না শ্রোতা?

পথিক নবী: ভালো ভালো কথা-সুরসহ কমপ্লিট করা যে গানগুলোর কথা বললাম সেগুলো টিভি লাইভে করেছি। রেসপন্স ভালোই পাচ্ছি। এটা এক ধরনের প্রি-প্রোডাকশন। ফাইনাল প্রোডাকশন বের করতে গেলে অনেক কিছু মেইনটেইন করতে হবে।

শুধু টাকা হলেই যে ভালো গান হবে-সেটা আমি বিশ্বাস করি না। সেই ধরনের মিউজিক লাগবে, অ্যারেঞ্জমেন্ট লাগবে। ভালো সঙ্গ লাগবে। সৃষ্টিশীল মানুষগুলো যদি এগিয়ে আসে তাহলে নতুন গান বাজারজাত করা সম্ভব হবে।

গ্লিটজ: আপনার মতো পরিচিত শিল্পীদের পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়ার ব্যাপারটাকে কিভাবে দেখছেন?

পথিক নবী: অডিও ইন্ডাস্ট্রিতে হাজার হাজার শিল্পী আছে। টিভি চ্যানেলগুলো শত শত স্টার জন্ম দিয়েছে। কত কত গান! আমার তো সমস্যা নাই। আমার মতো একটা মানুষ দেশে না থাকলেই বা ক্ষতি কি?
আমি ভালো কিছু করতে চাই-এ স্বপ্ন আমার ভেতরে এখনও আছে, আমি করবই। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি চেষ্টা করে যাব। হয়ত একসঙ্গে অনেকগুলো প্রোডাকশন দিতে পারব না কিন্তু একটা একটা করে প্রোডাকশন দেব।

আমার স্বল্প উপার্জনের ফাঁকে নিজেকে প্রমোট করব। কিন্তু দিনদিন খরচও বেড়ে যাচ্ছে। এখন আলাদা করে নিজের ক্যারিয়ারের প্রতি বিনিয়োগ করতে পারছি না।

গ্লিটজ: বিনিয়োগের জন্য জন্য বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন?

পথিক নবী: কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নাই। আমি বড় মানুষদের সঙ্গে চলাফেরা করি না। যাদের সঙ্গে সম্পর্ক আছে তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, তারা আমার গান ভালোবাসে, এতটুকুই। তাদের কাছ থেকে হুট করে স্পন্সর চাইতে পারি না। এত আন্তরিক সম্পর্ক কারো সঙ্গে নাই আমার।

এখন সামর্থ্যবান কেউ এগিয়ে এলে হয়তো গান করতে পারব। আমার বিশ্বাস মানুষ আমার গান পছন্দ করে।কাজ আমাকে করতে হয়। কাজ ছাড়া টিকে থাকব কিভাবে?

গ্লিটজ: অডিও ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন নিশ্চয়ই। তরুণদের গান নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

পথিক নবী: গান শুধুমাত্র শোনার বিষয় না এখন দেখারও বিষয়। এখনকার গানে দেখা, শোনা, কথা, সুরের সিঙ্কিংটা নাই। কথা দুর্বল, সুর উল্টাপাল্টা যাচ্ছেতাই একটা মিউজিক ভিডিও বানিয়ে ফেললাম-এগুলো মানুষকে খুব একটা বেশি আগ্রহী করে তোলে না।

গ্লিটজ: এক যুগে ই্ডাস্ট্রিতে বেশ পালাবদল ঘটেছে। অ্যালবামের জায়গা দখলে নিয়েছে ইউটিউব। নতুন গান নিয়ে শ্রোতাদের সামনে ফেরার আগে কী ধরনের পরিকল্পনা মাথায় রাখবেন?

পথিক নবী: বর্তমানে ছেলে-মেয়েরা যে ধরনের গান-বাজনা করে, নিজেকে ইউটিউবে প্রমোট করে সেই মেকানিজমটা এখনও রপ্ত করতে পারিনি। অনলাইন প্রচারের ক্ষেত্রটা আমার আয়ত্ব করতে হবে। একটি ওয়েবসাইট খুলতে হবে; ফেইসবুকে পেইজ খুলতে হবে। এগুলো শিখতেছি; করতে পারবও আশাকরি। কিন্তু সমস্যা হল, আমার কাছে যদি প্রোডাকশনই না থাকে তাহলে কী ছাড়ব?
গ্লিটজ: আপনার পুরানো কিছু গান তো ইউটিউবে প্রকাশ হয়েছে। সাড়া কেমন পাচ্ছেন?

পথিক নবী: পুরানো গানের মধ্যে ‘আগুন জ্বলে’ শিরোনামে গানটি প্রায় ১৭-১৮ লক্ষ ভিউয়ার্স পাওয়া গেছে। গানগুলোই দর্শকদের কাছে ছড়াচ্ছে ইউটিউব থেকে। অনেকে বলে, গানটা কবে গাইলেন? আমি বলি, গানটা পুরানো; বারো চৌদ্দ বছর আগের।

গ্লিটজ: ইউটিউব থেকে তো অনেক শিল্পী মোটা অংকের অর্থ রোজগার করছেন। গান থেকে আপনি কোনো সম্মানী পেয়েছেন?

পথিক নবী: এর আগে আমার যে গানগুলো বাজারজাত করা হয়েছে তার প্রায় সবগুলো গানের স্বত্ব যারা অর্থ বিনিয়োগ করেছেন তাদেরকে দিয়েছি। তারাই সেই গানগুলোর র‌য়্যালিটি পাচ্ছে।

গ্লিটজ: স্বত্ব আপনার নামে থাকলে তো বেশকিছু অর্থ পেতেন…

পথিক নবী: স্বত্ব থাকলে তো ভালোই হত। কিন্তু সেই স্বত্ব তো আমি ত্যাগ করে দিয়েছি। এবার নতুন আরো গান করতে চাই। ভালোভাবে বাজারজাতকরণ করতে চাই।

গ্লিটজ: সবশেষ প্রশ্ন। পথিক নবীর চোখে পথিক নবী কেমন?

পথিক নবী: আমার একা থাকতে ভালো লাগে। আমি আমার জগতে চিন্তা-ভাবনা করি। লাইব্রেরি কিংবা বাসায় টুকটাক পড়াশোনা করি। সবদিকেই চোখ আছে আমার। দেশের ভালো ভালো শিল্পীদের গান শুনি, টিভির লাইভ গান শুনি।

আমার বয়স ৪৭ বছর। পেছনে যদি তাকাই তাহলে এটার আলোকে আগামী ৫০ বছর দেখতে পারি আমি।

ব্যক্তিগতভাবে স্রোতের পালে চলার মানুষ না। আমি কর্পোরেট লিয়াজোঁ মেইনটেইন করার মানুষ না। আমি খুব সাদাসিধে একজন মানুষ। একা একা গাইতে গাইতে গায়ক। হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করতে পারি না।

সূত্র – বিডিনিউজ২৪