বাউলগানই বাংলাদেশের প্রাণ। সেই গানই কণ্ঠে ধারণ করে তিন দশক ধরে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রেখেছেন কিরণচন্দ্র রায় ও চন্দনা মজুমদার দম্পতি। মাটির গান গেয়েই শ্রোতাদের ভালোবাসা পাচ্ছেন, দিচ্ছেনও।

মানিকগঞ্জের ভাটিবয়ড়ায় আর কুষ্টিয়ার কুমারখালীর কুণ্ডুগ্রামের একটি বাড়িতে দিনের আলো নেভার আগেই বাউলরা এসে জড়ো হতেন। মাঝরাত পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই দুই বাড়িতে বসত বাউলগান, পালাগান, বৈঠকি গানের আসর। সুরে মেতে থাকত পুরো বাড়ি। সঙ্গে খিচুড়ি আর লাবড়ার স্বাদ।
দুই বাড়ি থেকেই বেড়ে ওঠা দুজন মানুষ—একজন কিরণচন্দ্র রায়, অন্যজন চন্দনা মজুমদার।
৩৫ বছর আগে কিরণচন্দ্র রায় গলায় তুলে নিয়েছিলেন বাউলগান। হাতে ধরেছিলেন একতারা, খঞ্জনি আর খমক। গায়ে গেরুয়া পোশাক। আজও বিদেশের নানা প্রান্তে গেয়ে বেড়ান লোকগান। তাঁর স্ত্রী চন্দনা মজুমদারের কণ্ঠেও অনুরণিত হয় মাটির গান। ঘরে চন্দনা তাঁর স্ত্রী, কিন্তু বাইরে তিনি শ্রোতাদের সম্পদ—এমনটাই ভাবেন কিরণচন্দ্র রায়।
দুজনের প্রথম পরিচয় ১৯৭৯ সালে, একটি গানের আসরে। কিন্তু তেমন কথা হয়নি সেদিন। ‘আমরা প্রেম করে বিয়ে করিনি। কিন্তু মনের যোগাযোগটা হয়তো ছিল।’ চন্দনার কথার রেশ না কাটতেই কিরণচন্দ্র রায় বলা শুরু করেন, ‘গানের জন্য আমাদের বাসায় চন্দনা মাঝেমধ্যেই আসত। আমরা তখন গুরুদুয়ারা নানকশাহীতে থাকতাম। আমার মা চন্দনার গান শুনে, ওর সঙ্গে কথা বলে ওকে পছন্দ করেন। তারপর পারিবারিকভাবেই আমাদের বিয়ে হয়।’ সেটি পরিচয়ের ১০ বছর পর—৯ মার্চ, ১৯৮৯ সালে।
দেশ-বিদেশের মঞ্চে, বেতার-টেলিভিশন, রেকর্ডিংয়ে দিন কাটে তাঁদের। ‘তোমাকে সংসারের কিচ্ছু দেখতে হবে না। তুমি শুধু গান গাইবে।’ বিয়ের পর চন্দনাকে এমনটাই বলেছিলেন কিরণচন্দ্র রায়। কিন্তু গানের পাশাপাশি শক্ত হাতে সংসারকেও সামাল দিচ্ছেন তিনি। আর শাশুড়ির সাহায্যের হাত তো আছেই। বিয়ের পর প্রথম দিকে একসঙ্গে রেওয়াজ করলেও এখন করেন না। কারণ, দুজন লোকগানের শিল্পী হলেও গান গাওয়ার ধরন, বোধ-ভাবনায় পার্থক্য অনেক। একমাত্র মেয়ে শতাব্দী রায় পিংকি কলকাতায় বিবিএ পড়ছেন, সঙ্গে শুদ্ধ সংগীতের তালিমও নিচ্ছেন। পিংকি বাড়িতে থাকলে মাঝেমধ্যেই রাতের বেলা গানের আসর বসান তিনজনে।
নানা রকম খুনসুটিতে ভরা কিরণচন্দ্র-চন্দনার সংসারজীবন। ষোলো আনা বাঙালিয়ানা জীবনযাপনে অভ্যস্ত কিরণচন্দ্র রায়ের মেজাজ খারাপ হয় যখন পাতে আমনের লাল চালের ভাত, পুঁটিমাছ ভাজা, পছন্দের শাকপাতাসহ প্রিয় খাবারগুলো না পান। এ ছাড়া প্রতি সন্ধ্যায় খাঁটি সরিষার তেলে মাখা মুড়ি কিরণচন্দ্র রায়ের চাই-ই, চাই। তিনি নিজে গ্রামে গিয়ে সরিষা কেনেন। ধান কেনেন। তারপর বসে থেকে তেল বানিয়ে, মুড়ি ভেজে আনেন। তুলনায় চন্দনার রাগ একটু বেশি। রেওয়াজের পর কিরণচন্দ্র রায় হয়তো হারমোনিয়ামটা ফেলে রাখলেন বা বাইরে থেকে এসে শার্টটা খুলে জায়গামতো রাখলেন না, তখন চন্দনা খুব রাগ করেন। কিন্তু স্বামী যখন আদুরে গলায় ‘চন্দনা’ নাম ধরে ডেকে এটা-ওটা চান বা ঘুরতে যাওয়ার কথা বলেন, সব রাগ পানি হয়ে যায়। তাঁদের প্রেম হয়েছে বিয়ের পর। সব কাজই স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করে করেন কিরণচন্দ্র রায়; কিন্তু চন্দনা শুধু বড় ব্যাপারেই স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করেন। এগুলো নিয়ে তাঁদের মধ্যে কোনো ভুল-বোঝাবুঝি হয় না। তাঁরা একে অপরের ছায়া। যেখানেই যান, একে অন্যের অস্তিত্ব অনুভব করেন।
প্রসঙ্গক্রমেই প্রশ্ন এল, কেন তাঁরা লোকগানকেই বেছে নিলেন? চন্দনা চোখ বুজে যেন শৈশবে চলে গেলেন। তাঁর বাবা নির্মলচন্দ্র মজুমদার লালনের গান করলেও মেয়েকে বানাতে চেয়েছিলেন নজরুলসংগীতশিল্পী। কিন্তু বাড়িতে লোকগানের আসর আর রেডিওতে ফরিদা পারভীনের গানে চন্দনা এতটাই মজলেন, আট বছর চর্চার পরও নজরুলগীতি ছেড়ে দিলেন। ফরিদা পারভীনের গুরু মকসেদ আলী সাঁই চন্দনাদের বাড়িতে আসতেন। তাঁর কাঁধে থাকত ঝোলা ব্যাগ, যাতে থাকত গানের খাতা আর গানের অনুষঙ্গ, যেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। মকসেদ আলী সাঁইয়ের কাছ থেকেই শুরু হলো লালনের গানের তালিম। আর কিরণচন্দ্র রায় তাঁর দাদুর কাছ থেকে জেনেছিলেন, বাউলগানেই মিশে আছে বাংলাদেশের পরিচয়। গানে গানেই চলে যাচ্ছে দিন, চলে যাচ্ছে বিরামহীন। এভাবেই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাঁচতে চান কিরণচন্দ্র রায় ও চন্দনা মজুমদার।

মাহফুজ জয়
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জুলাই ২১, ২০১১