চোখে যেন কী হয়েছিল ইরফান খান-এর। কালো চশমা খুলতেই চাইছিলেন না। চশমায় ফ্ল্যাশ পড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল আলোকচিত্রীদের ছবিগুলো। সেসবে পাত্তা দিচ্ছিলেন না এই অভিনেতা। অভিনয়ে যতটা সাবলীল তিনি, ততটা সহজিয়া তাঁর ব্যক্তিত্বেও। বলিউডে ‘মুডি’ আর গম্ভীর বলে প্রচলিত থাকলেও প্রথম আলোর কাছে তিনি ধরা দিলেন খুব হালকা মেজাজে। তাঁর অভিনীত মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত ডুব মুক্তির আগের দিন ভারতের কলকাতার এক পাঁচ তারকা হোটেলে কথা বললেন নানা বিষয় নিয়ে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আদর রহমান

ডুব-এ অভিনয় করলেন কেন?
মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর জন্য। তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের প্রথম মুহূর্ত থেকে বুঝতে পেরেছি, কতটা অসাধারণ মানুষ ও মেধাবী নির্মাতা তিনি। বাংলাদেশে এমন একজন গুণী চলচ্চিত্র নির্মাতা আছেন, আমার ধারণা ছিল না। তাঁর কথা ও ব্যক্তিত্ব আমাকে ডুব-এর অংশ হওয়ার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

আপনাদের পরিচয় কীভাবে হলো?
ই-মেইল চালাচালির মধ্য দিয়ে। তিনি আমাকে বিশাল এক মেইল লিখেছিলেন। সেটা পড়েই আমি ঠিক করে ফেলি যে, এই মানুষটির সঙ্গে আমার দেখা করতে হবে। ই-মেইলের জবাব দেওয়ার প্রতি আমার একধরনের আলস্য আছে। কিন্তু ফারুকী ভাইয়ের সেই মেইলের জবাব আমি সঙ্গে সঙ্গেই দিই। সেই থেকে শুরু হয় আমাদের যোগাযোগ, আলাপ, কাজ।

আপনি এই ছবির একজন প্রযোজকও। ‘ডুব’ থেকে আপনার প্রত্যাশা কী? বক্স অফিস থেকে লগ্নি তুলে আনা? নাকি আন্তর্জাতিক উৎসবে অবস্থান নিশ্চিত করা?
ডুব এরই মধ্যে অনেক আন্তর্জাতিক উৎসবে অংশ নিয়ে প্রশংসিত হয়েছে। আমার পরিকল্পনা এমনটাই ছিল। চেয়েছিলাম ডুব দেশ-বিদেশ ঘুরুক। যদিও প্রযোজক হিসেবে খুব সক্রিয় ভূমিকা আমি পালন করতে পারিনি। প্রযোজক হিসেবে সব পরিশ্রম করেছে কলকাতার এসকে মুভিজ এবং ঢাকার জাজ মাল্টিমিডিয়া। ছবির ব্যবসায়িক দিকগুলো তারাই দেখছে। তবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই ছবিকে নিতে পেরে আমরা আনন্দিত।

হুমায়ূন আহমেদের জীবনী অবলম্বনে এই ছবি বানানো হয়েছে—এই বিতর্ক শুরু হওয়ার পর কি সেই আনন্দে ভাটা পড়েছে?
কিছু কষ্ট তো পেয়েছিলামই। তবে সবচেয়ে বেশি মনঃক্ষুণ্ন হয়েছি, যখন জানলাম বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ছবিটি আগামী অস্কারে পাঠানো হচ্ছে না। ব্যাপারটা দুঃখজনক। পুরো বিতর্কটাই আমার কাছে দুর্ভাগ্যজনক মনে হয়। দেশের একটি মেধাবী নির্মাণ দেশের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। দেরি করে হলেও ব্যাপারটা সবাই বুঝতে পেরেছে। ছবিটি অবশেষে মুক্তি পাচ্ছে। এখন ছবি দেখে দর্শকই বিচার করুক, এটা জীবনের গল্প, নাকি জীবনী থেকে বানানো ছবি। এখন আর আমাদের কিছু বলার নেই। দর্শকের হাতে সব।

প্রযোজক হিসেবে বাংলাদেশের দর্শকদের কিছু বলতে চান?
এটা মানবিক গল্প। কোনো একজনের গল্প নয়। এটা স্পষ্ট করে বলছি আমি, এটা হুমায়ূন আহমেদের জীবনের গল্প নয়।

বাংলা কার কাছ থেকে শিখেছেন?
ফারুকী ভাইয়ের টিমের একজন সহকারীর কাছে। তা ছাড়া সব সময় ফারুকী ভাই, তিশা ওদের কথা বলা দেখতাম। কীভাবে বলে, কী বলার সময় অভিব্যক্তি কেমন দেয় আরও নানা কিছু। কলকাতার বাংলা থেকে বাংলাদেশের বাংলা তো অনেকটাই আলাদা। সত্যি বলতে, খুব কঠিন ছিল বাংলা শেখার অভিজ্ঞতা। একমাত্র এই ভাষা শেখার জন্যই আমাকে যত পরিশ্রম করতে হয়েছে। এর বাইরে অভিনয় করা, চরিত্রে ঢোকা সহজ ছিল আমার জন্য। কিন্তু বাংলা! কী যে করেছি, কে জানে? আশা করব তোমার দেশের মানুষেরা যেন আমাকে এই বাংলার জন্য ক্ষমা করে দেয়। তোমরা চাইলে আমার বাংলা নিয়ে ইচ্ছামতো মজা নিতে পার। কিচ্ছু মনে করব না আমি।

তিন দশক ধরে আপনি অভিনয়ের জগতে আছেন…
না না। এটা ভুল। আমি জানি না, কোত্থেকে সবাই এ তথ্যটা পায়! তিন দশক হবে না। ১৯৯৫ থেকে শুরু আমার অভিনয়। টিভি দিয়ে শুরু। এখনো তিন দশক হয়নি।

আচ্ছা, তাহলে দুই দশকের এই অভিনয়জীবন নিয়ে কী মনে হয়, সবচেয়ে ভালো আর মন্দ দিক কী?
একমাত্র অভিনয়েই সম্ভব নিজেকে খুব গভীর থেকে জানার। নিজেকে বারবার আবিষ্কার করার। আর মন্দ দিক হলো, একটা সময় নিজের ব্যক্তিজীবন বলে কিছু থাকে না।

আপনার সেই ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে জানতে চাই। প্রথম চাকরি কী ছিল?
টিউশনি করতাম। কলেজে পড়ার সময় আমার একটা সাইকেল কেনার ইচ্ছা হলো। কিন্তু টাকা ছিল না। তাই সাইকেল কেনার জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্র পড়াতাম।

এরপর তো এনএসডিতে স্কলারশিপ পেয়ে গেলেন। সেখান থেকে কি খুব সহজ ছিল পথচলা? ছেলে অভিনয় নিয়ে পড়বে, বাড়ির সবাই মেনে নিল?
আরে না। অত সহজ ছিল না। কেউ রাজি ছিল না। কেউ খুশি ছিল না। কারণ অভিনয় করা মানে জীবনে কিছুই না করা। অনেক কিছুর পর আমার এনএসডিতে যাওয়া হয়। সেখানে আমার এক কাছের বন্ধু ছিল, ওর নাম এমদাদুর রহমান। এনএসডির হয়ে আমি আর সে মিলে প্রথম একটা সিনেমা বানিয়েছিলাম। সে ছিল আমাদের ড্রামা স্কুলের সেরা নির্মাতা। আমি তাঁর নির্দেশনায় প্রথম অভিনয় করি হ্যারল্ড পিন্টারের ডাম্ব ওয়েটার-এ।

বন্ধু এমদাদের মতো আপনার অভিনয়জীবনে আর কোনো বাঙালির প্রভাব আছে?
অবশ্যই। ঋত্বিক ঘটক, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, এ সময়ের সুজিত সরকারের প্রভাব আমার জীবনে অনেক। কাজী নজরুল ইসলামের লেখা আমাকে জীবনের বিভিন্ন ধাপে সমৃদ্ধ করেছে।

সূত্র – প্রথম আলো।