অকালেই ঝরে গেছেন বাংলা সিনেমা জগতের জনপ্রিয় নায়ক মান্না। মাত্র ৪৮ বছর বয়সে গতকাল মারা গেছেন তিনি। অথচ শনিবার রাতেই এফডিসিতে একটি মুভির শুটিং করেছেন তিনি।
বার্তা সংস্থা বিডিনিউজ জানিয়েছে, শনিবার রাতে শুটিং শেষে বাসায় ফিরে হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করলে ভোর সাড়ে ৬টার সময় মান্নাকে রাজধানীর ইউনাইটেড হসপিটালে ভর্তি করা হয়। দুপুর আড়াইটায় সেখানেই তিনি মারা যান বলে জানিয়েছেন মান্নার ভগ্নিপতি সাবেক এমপি রিটায়ার্ড মেজর মঞ্জুর কাদের। তিনি বলেন, গতকাল ভোরে হৃদরোগে আক্রান্ত হলে সকাল সাড়ে ৬টায় তাকে হসপিটালে ভর্তি করা হয়।

ঢাকার রুপালি জগতে প্রায় দুই যুগের পদচারণায় প্রায় ৪০০ মুভিতে অভিনয় করেছেন মান্না। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছিলেন তিনি। দীর্ঘ চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাংলা সিনেমা জগতে নিজের আসন পাকাপোক্ত করতে হয়েছে তাকে।

ঢাকাই সিনেমার এ মন্দা সময়েও বেশ কয়েকটি ব্যবসা-সফল মুভি উপহার দিয়েছেন মান্না। মৃত্যুর সময়ও তার হাতে ছিল ডজনখানেক মুভি। ফিল্মে অশ্লীলতার বিরুদ্ধে আন্দোলনেও তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল।

আশির দশকে এফডিসির নতুন মুখের সন্ধানের মাধ্যমে বাংলা সিনেমায় আগমন ঘটে টাঙ্গাইলের এস এম আসলাম তালুকদারের। রুপালি পর্দায় পরিচিত হন মান্না নামে। ১৯৮৫ সালে নির্মিত আজহারুল ইসলাম পরিচালিত ‘তওবা’ মান্নার প্রথম মুভি। তবে প্রথম মুক্তি পায় কাজী হায়াতের ‘পাগলী’ মুভিটি।

বিভিন্ন পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে মান্না জানিয়েছিলেন, নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠায় প্রথম দিকে কেউই তাকে সাহায্য করেনি। বিভিন্ন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানে বসে থেকেছেন অভিনয়ে সুযোগ পাওয়ার জন্য, অথচ কেউ সুযোগ দেয়নি। তবে হাল ছাড়েননি। অধ্যবসায়ের গুণে ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রে স্থান করে নিতে এগিয়ে চলেন।

নায়ক হিসেবে তার উত্থান ৯০ দশকের শুরুতে এসে। ওই সময় কাজী হায়াত পরিচালিত ‘দাঙ্গা’, ‘ত্রাস’, ‘চাঁদাবাজ’ নামে তিনটি হিট মুভির মাধ্যমে বাংলাদেশের সিনেমা জগতে নিজের আসন পাকাপোক্ত করে নেন মান্না।

এরপর একে একে অনেক ব্যবসা-সফল মুভিতে অভিনয় করেন মান্না। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সিপাহী, আম্মাজান, স্বামী-স্ত্রীর যুদ্ধ, আব্বাজান, বর্তমান, কাশেম-মালার প্রেম, শান্ত কেন মাস্তান, প্রেম দিওয়ানা, তেজী, রাজধানী, দুই বধূ এক স্বামী, ক্ষমতার গরম ইত্যাদি।

এর মধ্যে আম্মাজান বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম ব্যবসা-সফল মুভি। অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করাও শুরু করেছিলেন তিনি। তার প্রযোজিত প্রথম মুভি লুটতরাজ। তার প্রযোজনায় উল্লেখযোগ্য মুভির মধ্যে রয়েছে মনের সাথে যুদ্ধ, স্বামী-স্ত্রীর যুদ্ধ, লাল বাদশা, আব্বাজান ইত্যাদি। বর্তমানে মান্না প্রযোজিত পিতামাতার আমানত-এর কাজ চলছিল। এ মুভিতে মান্নাও অভিনয় করছিলেন। তার বিপরীতে ছিলেন অপু বিশ্বাস।

প্রথম দিকে চম্পার সঙ্গে জুটি বেধে বেশ কয়েকটি মুভিতে অভিনয় করেন মান্না। দর্শকরা এ জুটিকে গ্রহণ করে। এছাড়া দিতি, মৌসুমী ও শাবনূরের সঙ্গেও তার ব্যবসা-সফল মুভি রয়েছে।
১৬ ফেব্রুয়ারি শনিবার রাতে এফডিসির ঝর্না স্পটে রাত ১১টা পর্যন্ত আহম্মেদ নাসির পরিচালিত গরীবের ছেলে বড় লোকের মেয়ে মুভির শুটিং করেন অকাল প্রয়াত এ নায়ক। সেই শুটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন মান্নার রাজধানী মুভির পরিচালক মোহাম্মদ হোসেন জেমী।

তিনি বলেন, শনিবার রাত ১১টা পর্যন্ত আমি তার সঙ্গে আড্ডা দিয়েছি। তারপর একসঙ্গে এফডিসি থেকে বের হয়ে যে যার বাসায় যাই। সেই মানুষটা আজ আর নেই। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না, সুস্থ একজন মানুষ কিভাবে হারিয়ে গেলেন।

মান্নার প্রথম মুভি তওবা-র চিত্রগ্রাহক মাহফুজুর রহমান বলেন, প্রথম মুভিতেই মান্না ভালো কিছু করার সম্ভাবনা দেখিয়েছিল। তিনি জানান, অভিনয় জীবনে মান্না ৩৭ জন নায়িকার সঙ্গে অভিনয় করেছেন। রুপালি জগতে অনেক নতুন নায়িকার আবির্ভাব হয়েছে মান্নার সঙ্গে অভিনয় করে।

ঢাকার চলচ্চিত্র বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলা সিনেমার মন্দা সময়েও মান্না ব্যবসা-সফল অনেক মুভি উপহার দিয়েছেন। এখনো অনেক প্রযোজক ও পরিচালক মুভি নির্মাণে নির্দ্বিধায় তার ওপর আস্থা রাখতেন।

স্বজন মঞ্জুর কাদের জানিয়েছেন, মান্নার স্ত্রী শেলী কাদের দুবাইয়ে অবস্থান করছেন। সেখান থেকে আজ রাতে (গতকাল) তিনি ফিরবেন। এরপরই পরবর্তী বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। মান্নার মরদেহ ইউনাইটেড হসপিটালেই রাখা আছে।

তার স্ত্রী শেলী কাদের বাংলাদেশ বিমানে চাকরি করেন। এ দম্পতির একমাত্র ছেলের নাম এস এম সিয়াম ইলতিমাস। মান্নার বাবা প্রয়াত এস এম নুরুল ইসলাম তালুকদার। বাড়ি টাঙ্গাইল শহরের কলেজপাড়ায়।

সূত্রঃ যায়যায়দিন।